স্মার্টফোন আমাদের সময় বাঁচাচ্ছে, নাকি সময়টাই কেড়ে নিচ্ছে?
স্মার্টফোন আমাদের সময় বাঁচাচ্ছে, নাকি সময়টাই কেড়ে নিচ্ছে?
প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আমরা প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে নিতে পারি, দূরের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারি, অনলাইনে পড়াশোনা করতে পারি এবং ঘরে বসেই নানা ধরনের কাজ সম্পন্ন করতে পারি। এসব সুবিধার বড় একটি অংশই এসেছে স্মার্টফোনের মাধ্যমে।
কিন্তু সুবিধার পাশাপাশি একটি প্রশ্নও সামনে এসেছে—আমরা কি স্মার্টফোন ব্যবহার করছি, নাকি ধীরে ধীরে স্মার্টফোনই আমাদের সময়কে নিয়ন্ত্রণ করছে?
স্মার্টফোনের সঙ্গে বদলে গেছে দৈনন্দিন জীবন
আগে অবসর সময় মানেই ছিল বই পড়া, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা নিজের মতো করে কিছু ভাবার সুযোগ। এখন সেই অবসর সময়ের বড় একটি অংশ চলে যাচ্ছে মোবাইলের পর্দায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ছোট ভিডিও, অনলাইন গেম, বিভিন্ন অ্যাপ ও নোটিফিকেশন আমাদের মনোযোগকে বারবার অন্যদিকে নিয়ে যায়। আমরা অনেক সময় মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিই, কিন্তু কখন যে দীর্ঘ সময় পার হয়ে যায় তা বুঝতেই পারি না।
সময় কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে?
দিনের ২৪ ঘণ্টা সবার জন্যই সমান। কিন্তু সেই সময়ের ব্যবহার একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম। পড়াশোনা, কাজ, পরিবার, বিশ্রাম এবং নিজের উন্নতির জন্য যে সময়টি প্রয়োজন, তার একটি অংশ যদি অপ্রয়োজনীয় স্ক্রলিংয়ে চলে যায়, তাহলে দিনের শেষে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, সময় হারানোর বিষয়টি সবসময় চোখে পড়ে না। কারণ স্মার্টফোনে আমরা একসঙ্গে অনেক কিছু দেখতে পারি। একটি ভিডিও থেকে আরেকটি ভিডিও, একটি পোস্ট থেকে আরেকটি পোস্ট—এভাবেই সময় চলে যায়।
বই পড়ার অভ্যাস কেন কমছে?
বই পড়ার জন্য ধৈর্য ও মনোযোগ প্রয়োজন। একটি বই শেষ করতে সময় লাগে এবং বিষয়টি বুঝতে কিছুটা একাগ্রতা দরকার। অন্যদিকে স্মার্টফোনে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই নতুন নতুন তথ্য পাওয়া যায়।
ফলে অনেকের কাছে দীর্ঘ লেখা বা বই পড়ার চেয়ে ছোট ও দ্রুত পাওয়া যায় এমন কনটেন্ট বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এর ফলে নিয়মিত বই পড়ার অভ্যাস ধীরে ধীরে দুর্বল হতে পারে।
স্মার্টফোন কি তাহলে বাদ দিতে হবে?
অবশ্যই নয়। স্মার্টফোন বর্তমান জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। পড়াশোনা, যোগাযোগ, তথ্য সংগ্রহ, সৃজনশীল কাজ এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে এর ব্যবহার অত্যন্ত উপকারী হতে পারে।
মূল বিষয় হলো ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য রাখা। প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করার পর অকারণে দীর্ঘ সময় ফোনে কাটানোর অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
প্রযুক্তি ব্যবহার হোক উদ্দেশ্যপূর্ণ
আমরা যদি ফোন ব্যবহারের আগে নিজের কাছে একটি প্রশ্ন করি—“আমি এখন ফোনটি কেন হাতে নিচ্ছি?”—তাহলে অনেক অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার কমানো সম্ভব।
পড়াশোনার জন্য ফোন ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট কাজ শেষ করা, তথ্য খোঁজার জন্য ব্যবহার করলে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা এবং বিনোদনের জন্য ব্যবহার করলে তার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় রাখা যেতে পারে।
পরিবার ও নিজের জন্য সময়
একই ঘরে বসে থেকেও যদি পরিবারের প্রত্যেকে নিজের নিজের ফোনে ব্যস্ত থাকে, তাহলে শারীরিকভাবে কাছাকাছি থেকেও মানসিক দূরত্ব তৈরি হতে পারে। তাই প্রতিদিন কিছু সময় ফোন থেকে দূরে থেকে পরিবারের সঙ্গে কথা বলা, বন্ধুদের সঙ্গে সরাসরি সময় কাটানো কিংবা নিজের পছন্দের কোনো বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করা দরকার।
দিনের কিছু সময় যদি ইচ্ছাকৃতভাবে স্ক্রিনের বাইরে রাখা যায়, তাহলে নিজের চিন্তা, সৃজনশীলতা ও মনোযোগের জন্যও জায়গা তৈরি হয়।
তরুণদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
তরুণ বয়স শেখার, দক্ষতা তৈরি করার এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার সময়। এই সময়ে স্মার্টফোনকে শুধু বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার না করে শেখা ও সৃজনশীলতার কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
অনলাইন কোর্স, শিক্ষামূলক ভিডিও, ডিজাইন শেখা, লেখালেখি, প্রোগ্রামিং, ভাষা শিক্ষা কিংবা নতুন কোনো দক্ষতা অর্জনের জন্য স্মার্টফোন অনেক কার্যকর একটি মাধ্যম হতে পারে।
শেষ কথা
স্মার্টফোন আমাদের সময় বাঁচাতে পারে, আবার অসচেতন ব্যবহারে সেই সময়ই কেড়ে নিতে পারে। বিষয়টি নির্ভর করছে আমরা প্রযুক্তিকে কীভাবে ব্যবহার করছি তার ওপর।
তাই প্রশ্নটি শুধু “স্মার্টফোন কতক্ষণ ব্যবহার করছি?”—এমন নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, “স্মার্টফোন ব্যবহার করে আমি কী অর্জন করছি?”
প্রযুক্তি ব্যবহার করি, কিন্তু সময়ের নিয়ন্ত্রণ যেন আমাদের হাতেই থাকে।
Post a Comment
আপনার বার্তা বা মতামত লিখুন!